মাহমুদুর রহমান লায়েক: হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সরওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সোমবার নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিকভাবে এটি তাঁর চাকরিজীবনের কোনো অবনমন নয়। তবে সিলেটের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে এই বদলি হতাশা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, দায়িত্ব পালনকালে তিনি একজন সৎ, সাহসী, কর্মঠ ও জনবান্ধব প্রশাসক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
সিলেটে যোগদানের পর তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তবে সম্প্রতি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কয়েক শত বছরের প্রচলিত রেওয়াজ পরিবর্তন করে মাজারের দানের ডেগ সিলগালা করা, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানবাক্স স্থাপন, আনসার মোতায়েন এবং সিসি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা দেখা দেয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, মাজারের আয়-ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মাজার-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও রেওয়াজে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা।
তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, সরওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে শুধুমাত্র মাজার–সংক্রান্ত ঘটনাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। তাদের প্রশ্ন—একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পেছনে কি কেবল একটি ঘটনাই কাজ করেছে, নাকি এর নেপথ্যে আরও বৃহত্তর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা রয়েছে?
২৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সরওয়ার আলম দীর্ঘদিন ধরেই দেশের প্রশাসনিক অঙ্গনে পরিচিত একটি নাম। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে শত শত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেটে তাঁর বদলির খবরে অনেক নাগরিক বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই ফোন করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রশ্ন তুলছেন—জনগণের আস্থা অর্জনকারী একজন কর্মকর্তাকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ার পেছনের কারণ কী?
অনেকের মতে, মো. সরওয়ার আলমের এই বদলিতে তাঁর ব্যক্তিগত বা চাকরিগত কোনো ক্ষতি হয়নি; কারণ তিনি উপসচিব পদেই দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু ক্ষতি হয়েছে সিলেটের মানুষের, যারা একজন দৃশ্যমান, সাহসী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসককে হারালেন।
এমনও মত রয়েছে যে, এই বদলিতে অসাধু, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও স্বার্থান্বেষী মহল খুশি হতে পারে; অন্যদিকে সাধারণ মানুষ কষ্ট পেয়েছে। যদিও এসব মতামত ব্যক্তিগত ও জনমতের প্রতিফলন, তবুও এগুলো বর্তমানে সিলেটজুড়ে আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। কারণ মানুষ এমন প্রশাসন দেখতে চায়, যেখানে সততা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
সব মিলিয়ে, মো. সরওয়ার আলমের প্রত্যাহার এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বদলির ঘটনা নয়; এটি সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সময়ই বলে দেবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত তাৎপর্য কী ছিল। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সিলেটে মো. সরওয়ার আলমের কর্মকাণ্ড এবং তাঁর প্রত্যাহার, দুটিই দীর্ঘদিন জনআলোচনায় থাকবে।