সাদা পাথর লুটপাট দুদকের তালিকায় বিএনপি নেতা কয়েস লোদী,জামায়াত নেতা জয়নাল,এনসিপি নেতা নাজিম
সাদা পাথর লুটের পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট দলের তদন্তদল। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হচ্ছিল, ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল…!’ এবার দুদকের অনুসন্ধানে লুটেরা তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। দুদকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বরাত দিয়ে একটি গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও ৪২ জন পাথর লুটেরার নাম প্রকাশ হওয়াকে ‘রাজনীতিকরণ করে ঘটনাটি হরণ’ করার প্রয়াস বলে জানিয়েছেন বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, প্রকৃত পাথর লুটেরাদের আড়াল করতেই মিথ্যাচার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুদকের তালিকায় শীর্ষে থাকা নামটির বিএনপি নেতা রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
বুধবার (২০ আগস্ট) একটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় দুদকের লুটেরা তালিকা। এ তালিকায় প্রথম নামটি সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুদককে লুটেরা প্রমাণ করতে হবে। নইলে ক্ষমা চাইতে হবে।’
এ নিয়ে মহানগর বিএনপির দুই নেতা বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে দুদককে তালিকা সংশোধনসহ ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, জামায়াত নেতাদের জড়িত বিষয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পাথর লুটের সঙ্গে দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই জামায়াতের’।
আর নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি নিজেদের ‘ইনোসেন্ট’ দাবি করছে।
জানা গেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে ‘সাদাপাথর’ এলাকায় পাথর লুটে রাজনৈতিক দলের নেতাদের যোগাসাজশ তদন্ত করতে মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের একটি দল। ১৩ আগস্ট সরেজমিনে তদন্ত করে।
দুদক সূত্র জানায়, তদন্ত দলের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরমধ্যে ৪২ জনের নাম প্রকাশ হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় ৪২ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরা স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান ও অনুসন্ধান চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে প্রায় ১০ লাখ ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, এর মধ্যে আড়াই লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, গত এক বছরে প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট পাথর অবৈধভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। পাথর লুটের ঘটনা প্রকাশ হলে সাদা পাথর, ভোলাগঞ্জসহ জাফলংয়ের বিষয়টিও দুদক পর্যবেক্ষণ করে।
লুটেরাদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, জড়িতদের মধ্যে বিএনপির ২০ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন। এদের মধ্যে শীর্ষ নামটি সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
এছাড়া, আছেন সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি (পদ হারানো) হাজি সাহাব উদ্দিনসহ সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকসুদ আহমদ, পদ হারানো জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ওরফে শাহপরান ও শাহ আলম ওরফে স্বপনসহ ২০ জন।
জামায়াতের দুই নেতা হচ্ছেন, সিলেট মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. ফকরুল ইসলাম ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন।
নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলার প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন সাহান ও মহানগর প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
আত্মগোপনে থেকেও লুটে জড়িত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। তারা হলেন, বিলাল মিয়া, শাহাবুদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল ওদুদ আলফু, কর্মী মনির মিয়া, হাবিল মিয়া ও সাইদুর রহমানসহ আরও ১১ জন।
লুটের ঘটনায় খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যদের কর্তব্যে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়।
‘রাজনীতিকরণ করে হরণ’ বিষয়ে যোগাযোগ করলে এ নিয়ে দুদকের সিলেট কার্যালয় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
তালিকার ১ নম্বরে সিলেটে সজ্জন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি, সিলেট সিটি করপোরেশনের একটানা পাঁচবার নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সাবেক প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর নাম রয়েছে। তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে আছেন।
খবরের কাগজকে কয়েস লোদী বলেন, ‘এটা প্রকৃত লুটেরাদের আড়াল করার একটি তৎপরতা। পাথর লুট করতে হলে পাথরব্যবসা থাকতে হবে। বালু-পাথর ব্যবসার সঙ্গে জীবনেও কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অথচ লুটেরা তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে। এ তালিকা প্রকৃত লুটেরাদের আড়াল করতেই করা হয়েছে। যারা তালিকা করেছেন, তাদেরকেই আমার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় ক্ষমা চাইতে হবে।’
রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে এই নগরীর সবাই চেনেন। শুধুমাত্র সনাতন পদ্ধতিতে পরিবেশ রক্ষা করে পাথর কোয়ারি লিজ দেওয়া দাবিতে বক্তব্য রাখাই যদি আমার দোষ হয়, এখনও আমি পরিবেশ প্রকৃতি রক্ষা করে পাথর উত্তোলনের পক্ষে। তবে লুটের পক্ষে কখনো দাঁড়াইনি। যারা লুটপাট করেছে তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
এদিকে, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘পাথর লুটে তার নাম জড়িয়ে একটা চক্র অপপ্রচার করছে। যার ধারাবাহিকতায় সংবাদমাধ্যমও অসত্য তথ্য প্রকাশ করছে।’ তবে এমন তথ্য প্রচারিত হওয়ায় বিচলিত নন বলে জানান।
এ নিয়ে আজ বুধবার সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমির ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ও হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান এবং মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘দুদকের বরাত দিয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও জেলা সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীনের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে জামায়াত নেতারা দুরে থাক, সাধারণ কোনো কর্মী-সমর্থকের ন্যুনতম কোনো সম্পর্ক নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও বৈধ পন্থায় পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে সিলেটের পরিবহন মালিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি কর্মসূচিতে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতারাও বক্তব্য রাখেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ওই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক রিপোর্ট প্রকাশ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পাথর লুটের সঙ্গে দুরতম কোনো সম্পর্ক নেই।’
বিবৃতিতে সিলেট জামায়াত নেতারা আরও বলেন, ‘এর আগে গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ১০৩ জন পাথর লুটকারী চিহ্নিতের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদে কোথাও জামায়াতের কোনো নেতা-কর্মীর নাম পাওয়া যায়নি। শুধু একটি পত্রিকার রিপোর্টে জামায়াত নেতাদের নাম জড়ানোর ঘটনায় আমরা বিস্মিত। যা পাথর চুরিতে জড়িত প্রকৃত আসামিদের আড়ালের অপচেষ্টা বলে আমরা মনে করি।’
তবে এ সম্পর্কে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এনসিপি কেবল পাথরমহাল সনাতন পদ্ধতিতে খুলে দেওয়ার দাবির সঙ্গে একাত্ম ছিল। যে দুই নেতা পাথরমহাল খোলার দাবিতে সরব ছিলেন, তাদেরকে দুদক তালিকায় জড়ানো হয়েছে দাবি করে, সংগঠনটির এক সদস্য বলেন, ‘এনসিপি ইনোসেন্ট। কোনো সিনে নেই। এরপরও দুদকের তালিকায় নাম এসেছে। এসব নিয়ে স্থানীয়ভাবে নয়, কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে আমরা প্রতিকার চাইব। প্রকৃত লুটেরা চক্র দুদককে দিয়ে এটি করে ঘটনা রাজনীতিকরণ করছে।’
মুল রিপোর্টঃ খবরের কাগজ