সিলেটে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের মেগা প্রকল্প ‘কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প’। প্রায় ৭২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের তেমুখীতে একটি গোলচত্বর করার মধ্য দিয়ে গত বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। গোলচত্বর করতে গিয়ে যেন গোলকধাঁধায় পড়ে সওজ। তখন সরকারি জায়গায় একটি পেট্রল পাম্পের কথিত বন্দোবস্তের চুক্তিনামার তথ্য প্রকাশ পায়। প্রকল্পের গোলচত্বর অংশের কাজ তখন থেকে বন্ধ রাখা হয়।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সওজ এ বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখে জায়গা বন্দোবস্তের চুক্তিনামাটিই জাল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে পেট্রল পাম্প মালিক মো. হেলাল উদ্দিন ক্ষমতার দাপটে জাল চুক্তিনামা দেখিয়ে ফোর লেন প্রকল্পের শেষ অংশের কাজ থামিয়ে দিয়েছিলেন। এ নিয়ে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খবরের কাগজে ‘পেট্রল পাম্পে আটকা ফোর লেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। প্রতিবেদন সূত্রে সওজের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অনুসন্ধান করে চুক্তি জাল করার সত্যতা পায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটানা প্রায় ৩০ বছর সরকারি জমি দখল করে পেট্রল পাম্পের ব্যবসায় অন্তত শতকোটি টাকা অবৈধভাবে রোজগার করেছেন হেলাল। তৎকালীন সরকারদলীয় কাউন্সিলর হওয়ার দাপটে জমি দখলমুক্ত করতে সওজের পক্ষ থেকে সব রকমের পদক্ষেপ নেওয়া ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন।
হেলাল সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। ওই সময় খবরের কাগজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে হেলালের দাবি ছিল, মোট ১৪ ডেসিমেল জায়গা পেট্রল পাম্পের। এটা তার ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গা। পেট্রল পাম্পের সামনে প্রায় সমপরিমাণ সরকারি জায়গা তিনি বন্দোবস্ত নিয়ে ব্যবহার করছেন।
পেট্রল পাম্পটির নাম ‘সফাত উল্লাহ সিএনজি ফিলিং স্টেশন’। সওজ পেট্রল পাম্পসহ সেখানকার অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাট অভিযান করতে গেলে তা স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন। ওই রিট পিটিশনে তিনি সওজ এবং সিলেট জেলা পরিষদের সঙ্গে করা একটি চুক্তিনামা দাখিল করেন। এতে করে বন্ধ রাখা হয় ফোর লেন প্রকল্পের গোলচত্বরের কাজ। এরপর সওজ চুক্তিপত্র বের করে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, পেট্রল পাম্পের জায়গাটি জেলা পরিষদের মালিকানাধীন। আগে খাল ছিল। হেলাল সেখানে মাছ চাষ করতে এক বছরের জন্য লিজ নিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে। কিন্তু মাছ চাষ না করে তিনি সেখানে মাটি ভরাট করে পেট্রল পাম্পের সঙ্গে যুক্ত করেন। জেলা পরিষদের সঙ্গে কথিত চুক্তিনামায় হেলাল উল্লেখ করেন ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তাকে সাইল শ্রেণির ভূমি লিজ দিয়েছে সিলেট জেলা পরিষদ। কিন্তু সাইল শ্রেণির ভূমি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে লিজ দেওয়ার কোনো নিয়মই নেই। এমনকি ওই চুক্তিনামায় সাক্ষী হিসেবে তৎকালীন সিলেট জেলা পরিষদের সহকারী এম এ সাত্তারের যে স্বাক্ষর রয়েছে, তা জাল করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় সওজ।
যোগাযোগ করলে সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পেট্রল পাম্পের লিজ নেওয়া জায়গা ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত নবায়ন করা। এরপর লিজগ্রহীতা চাইলেও আর নবায়নের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সেই জায়গায় এখন যা হবে বা হচ্ছে, তা এক কথায় অবৈধ।’
সওজের ভূমি শাখা সূত্র জানায়, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক নির্মাণ ও প্রশস্তকরণের জন্য সওজ সড়কের পাশের জমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণ করা ভূমির দাগে হেলাল পেট্রল পাম্পের চলাচলের কারণে পাকা কালভার্টসহ সংযোগ রাস্তা নির্মাণের অনুমতির জন্য সওজ থেকে ভূমি লিজ অনুমতিপ্রাপ্ত হন। অনুমতিপ্রাপ্ত লিজ অনুযায়ী গ্রহীতা পাঁচ বছর খাজনা প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে লিজের খাজনার রাজস্ব প্রদান না করার কারণে লিজের অনুমতিপত্রের শর্ত সাপেক্ষে লিজটি ১৯৯৫ সাল থেকে বাতিল হয়ে যায়।
এরপর হেলাল পেট্রল পাম্পসহ ওই ভূমিতে অবৈধভাবে দোকানপাট নির্মাণ করেন। তখন সওজ উচ্ছেদ অভিযান করতে গেলে তিনি তা স্থগিত চেয়ে প্রথম দফা ২০০৭ সালে উচ্চ আদালতে রিট করেন। ওই রিটের কোনোরূপ প্রতিকার না পেয়ে পুনরায় ২০১৫ সালে দ্বিতীয় দফা রিট করেন। এতে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে যে চুক্তিপত্র উল্লেখ করা হয়েছিল, জেলা পরিষদ বা সওজ দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো চুক্তি সম্পাদন হয়নি। তখন চুক্তিপত্রটি জাল ও প্রতারণামূলক বলে প্রতীয়মান হয়।
২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশের পর ১২ মার্চ হেলাল ওই কাগজপত্রের মাধ্যমে আরেকটি স্থগিতাদেশের কপি সওজে হস্তান্তর করেন। এর বিরুদ্ধে সওজ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আবার আপিল করে।
গত বুধবার সওজের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই পাম্পের জায়গা আমাদের। কিন্তু হেলাল জাল চুক্তিনামা দেখিয়ে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন। তার দায়ের করা রিট মামলায় দেওয়া চুক্তিনামাটি ভুয়া ও মিথ্যা। ৩০ বছরের খাজনা প্রদান করা হয়েছে মর্মে সকল তথ্যও ভুয়া। সেটা সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।’
১৯৯১ সালে ৩০ বছরের জন্য সওজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তিই হয়নি জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘তিনি (হেলাল) তৎকালীন চুক্তিনামা দেখিয়েছেন, যা কম্পিউটারে টাইপ করা। কিন্তু ১৯৯১ সালে আমাদের দপ্তরে কোনো কম্পিউটার ছিল না। তখন সব কাজ হাতে লিখে হতো। জালিয়াতির বড় প্রমাণ এটিই।’
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে মহাসড়কের পাশে মহামূল্যবান সরকারি জায়গায় পেট্রল পাম্প ব্যবসাই তার আর্থিক ভিত্তি। এই দখলযজ্ঞে ৭২৭ কোটি টাকার প্রকল্পকাজ আটকে থাকার পাশাপাশি পেট্রল পাম্প ব্যবসায় হেলাল গত ৩০ বছরে অন্তত শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। স্থানীয় লোকজন এ জন্য তাকে অধিক লাভবান অর্থে ‘লাল’ হেলাল বলে অভিহিত করছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে হেলাল সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের দাপটে চলাচল করতেন। এরপর ক্ষমতার রাজনীতির পালাবদলে সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের স্ত্রী সেলিনা মোমেনের প্রভাবকে পুঁজি করে চলেন।
পেট্রল পাম্পে সরকারি জায়গা ব্যবহারে ভুয়া চুক্তিনামার বিষয়ে হেলালের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তেমুখীর বাসিন্দা তার কয়েক ঘনিষ্ঠজন জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে তেমুখীর পাশে অবস্থিত সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন ঠেকাতে মাঠে তৎপর ছিলেন হেলাল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থী রুদ্র সেন হত্যা মামলায় আসামি হওয়ায় হেলাল প্রকাশ্যে চলাচল এড়িয়ে চলছেন। মামলার এজাহারে তিনি ৬৩ নম্বর আসামি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে পেট্রল পাম্পে গিয়ে হেলালের দেখা মেলেনি। পেট্রল পাম্প থেকে জানানো হয়, তিনি (হেলাল) বাইরে আছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করে বন্ধ পাওয়া গেছে। ফেসবুকে সক্রিয় দেখা গেলেও মেসেঞ্জারে কল করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সুত্রঃ খবরের কাগজ