সিলেটের গোয়ানঘাট সীমান্ত এখন চোরচালানের স্বর্গরাজ্য। সরকার বদলের সাথে সাথে চোরাচালান সেই রাজ্যর নিয়ন্ত্রক এখন রাজনৈতিক লেবাসধারী বেশ কয়েকজন। এদের সকলের পরিচয় পুলিশ কিংবা বিজিবির লাইনম্যান হিসাবে। প্রতিমাসে চোরাচালানের এই লাইনম্যান আবার রদবদল করে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, সার্কেল এসপি, বিট অফিসার, জেলা উত্তর (ডিবি)র নিয়োগপ্রাপ্ত ওসি ও বিজিবির বিভিন্ন ক্যাম্প কামান্ডারগণ।
যে কারণে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি, বা জেলার এসপির কোন নির্দেশ বা আদেশ কার্যকর হচ্ছেনা গোয়াইনঘাট থানা এলাকায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেট রেঞ্জে ডিআইজি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনায় সভায় এসব সীমান্তের চোরাচালান বন্ধ করতে জেলার এসপিদের কঠিন নির্দেশনা দিয়ে ছিলেন।
কিন্তু কোন নির্দেশনাই আমলে নেয়নি গোয়াইনঘাট থানার ওসি সরকার তোফায়েল ও সার্কেল সাহিদুল ইসলাম, জহির লাল ।তবে চোরাচালান বন্ধের বদলে পাল্টেছে চোরাচালান সচল রাখারার নিত্য নতুন কৌশল। আগে প্রতি মাসে সীমান্তের ঘাট অলিখিত ইজারা দেওয়া হতো মাসিক ২০/২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে। কিন্তু এখন চলছে কমিশনের খেলা। গত শুক্রবার সরেজমিন গোয়াইনঘাট এলাকায় গেলে নতুন করে উঠে আসে চোরাচালান নতুন নিয়ন্ত্রকদের নাম।
এরা বেশীর ভাগই জাতীয়তাবাদী বিএনপির রাজনৈতীক লেবাসদারী। আগে যেসব চোরাচালানের লাইন নিয়ন্ত্রণক করতো স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগের নেতারা। গত ৫ আগষ্টের পরে এসব লাইন নিয়ন্ত্রন করছেন যুবদল, শ্রমিকদলের কতিপয় কিছু পাতি নেতা। যদিও চোরাচালানে অভিযোগে জেলা বিএনপি বেশ কয়েকজন দল থেকে স্থায়ী ভাবে বহিস্কার করেছে।
উপজেলার পূর্বজাফলং সীমান্তের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন আব্দুল মান্নান উরফে মান্নান মেম্বার। তিনি জাফলং গুচ্ছ গ্রামের সাদ্দাম রুহির ছেলে। তিনি চোরাচালানের মাঠে এখনও অপ্রতিরোধ্য। গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। এই মান্নান মেম্বার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান। তার বাহিনীতে আছেন বেশ কয়েকজন। মান্নান গ্রæপের সদস্যরা স্থানীয় থানার ওসি সরকার তোফায়েল ও জেলা উত্তর ডিবির ওসির নামে চোরাচালানের টাকা উত্তোলন করেন। এরা প্রতি বস্তা চিনি থেকে ২ শত টাকা চাঁদা নেয়। এর মধ্যে ১শত টাকা প্রশাসনের জন্য বরাদ্ধ আর ১শত টাকা মান্নানের। এরকম প্রতিদিন কয়েক হাজার বস্তা চিনি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিকার্টন কিট ৫শত টাকা, কসমেটিক্স প্রতি কার্টন ১ হাজার টাকা করে নিচ্ছে মান্নান ওতার গ্রæপের সদস্যরা। পূর্ব জাফলং সীমান্তে নলজুরি, তামাবিল স্থলবন্দর, আমতলা, সোনাটিলা, সংগ্রাম পুঞ্জি, লালমাটি, সাইনবোর্ড, ক্যাম্প ক্যান্টিন, জিরো পয়েন্ট, সিড়িঘাট পর্যন্ত মান্নান মেম্বারের একক নিয়ন্ত্রনে চলে চোরাচালান। এসব স্পটে বিজিবির লাইনম্যান হিসাবে টাকা আাদায় করেন, হযরত, রজব আলী, আজির উদ্দিন, ফয়েজ। মান্নানের স্পষ্ট বক্তব্য পুলিশের কাছ থেকে কমিশনে লাইন এনে ব্যবসা করছি এসপি, ডিআইজির কিছু করার নাই।
তবে গত ১৬ তারিখ রাতে জাফলং এলাকায় চোরাচালান সিন্ডিকেটের একটি বৈঠক বসে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মান্নান মেম্বার চলে যাবেন আড়ালে সামনে আসবেন সামছুল উরফে কালা সামছু। তিনি এখন মান্নান মেম্বারের সব লাইন দেখাশুনা করবেন। এমনটি জানিয়ে দেওয়ার হয় থানার ওসি,সার্কেল ও বিজিবিকে। অপর দিকে উপজেলার মাতুরতল, সোনারহাট, পান্তুমাই, বাবুর কোনা এলাকার চোরাচালানের একক নিয়ন্ত্রন করেন সাবেক যুবলীগ নেতা হাতিরখাল গ্রামের হাতিরখাল গোচর গ্রামের মশাহিদ আলীর ছেলে কালা মিয়া উরফে শ্যামকালা। শ্যামকালা থানা ও জেলা উত্তর ডিবির ওসির নিয়োগকৃত লাইনম্যান। যুবলীগ থেকে যুবদলে পদ পেতে তিনি ১০ লাখ টাকার একটি গোপনে চুক্তি করেছে বলে গুঞ্জন উছেঠে। গত শনিবার রাতে নতুন করে থানার ওসি তোফায়েল সরকার আবার উপজেলার পশ্চিমাংশের জন্য লাইনম্যান হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন এই শ্যাম কালাকে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিজির টহল বৃদ্ধির ফলে জাফলং এলাকায় গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার চোরাচালানের লাইন বন্ধ ছিলো। কিন্তু শ্যাম কালার দিকের লাইন দিয়ে দেশে প্রবেশ করে ভারতীয় পণ্য। বর্ডারে দায়িত্বে থাকা বিজিবির সামনে দিয়ে ভারত থেকে এসব চোরাচালানের পন্য সরাসরি দেশে প্রবেশ করলেও টাকার কাছে সকলেই ম্যানেজ হয়ে যান। কাঁচা টাকার লোভে পড়ে ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা কামান্ডাররা নিয়োগ নেন নিজস্ব লাইন ম্যান। রাত হলে গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকার চিত্র পাল্টে যায়। হয়ে উঠে চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য। স্থানীয় লোকজন আরো জানান, গোয়াইনঘাট উপজেলা সার্কেল অফিসার ও থানার ওসিসহ সবকয়েকটি বিজিবি ক্যাম্পের কামান্ডারগণ সরাসরি এসব চোরাচালানের নিয়ন্ত্রক হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছেনা।