সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এখন পরিচালক মো.আব্দুল্লাহ আল মামুন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো.জাকির হোসেন তিনি আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল আলম নাদেলের ধর্ম ভাই ও সোহেল আল মাসুম এবং সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো.রুবেল ইসলাম রাহাত, ডাটা এন্টি,কন্ট্রোল অপারেটর মো.মহিউদ্দিন খান। এই চারজনই পাসপোর্ট অফিসের মূল সিন্ডিকেটের হয়ে পাসপোর্ট অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। আরো দুটি সিন্ডিকেট রয়েছে অফিসের ভিতরে, অফিসের আনসার প্রহরী মোস্তফা কামাল ও পরিচালক মামুনের পিএ রুবেল আহমদ রাহাত, অফিস সহকারী জাকির হোসেন। সকলে মিলে গড়ে তুলেছেন একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট। জাকির ও মাসুমের নিয়োগকৃত দালালরা পাসপোর্ট অফিসের উত্তর দিকে ও পশ্চিম দিকের একটি দোকানে বসে ফাইল সংগ্রহ করেন।
সিলেটের কিছু সাংবাদিককে প্রতিদিন কৌটা হিসাবে ফাইল জমা নিয়ে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে নিজেদের দূর্নীতিকে প্রমোট করে যাচ্ছেন। পাসপোর্ট অফিসের নিয়োজিত দালালদের মধ্যে অফিস ঘুরে যে কয় জনের নাম পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে কিরন দেবনাথ, তার একটি দোকান রয়েছে পাসপোর্ট অফিসের বিপরীতে। এই কিরণ দেবনাথ অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো.জাকির হোসেন যিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল আলম নাদেলের ধর্ম ভাই পরিচয় দিতেন তার এবং পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের নিজস্ব নিয়োগকৃত লোক হিসাবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর থেকে পাসপোর্ট অফিসে দালালী করে আসছেন। দালালী করে করেছেন গাড়ি-বাড়ি। এই কিরণ দেবনাথ (৫৭) বিগত ২০২৩ সালে ৩১ জানুয়ারী র্যাবের অভিযানে আরো ৩ দালালসহ আটক হয়ে ছিলেন।
অভিযানকালে ভ্রাম্যমান আদালত কিরনসহ মো. আব্দুল মতিন (৪৯), মো. রাজু আহমদ (৪০) ও পিয়াস মিয়া (২৪) নামের আরো ৩ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন। জেল থেকে বেরিয়ে কিরন দেবনাথ আবারও পাসপোর্ট অফিসে দালালী শুরু করেন।
কিরন দেবনাথ নিজেকে কখনো সাংবাদিক কখনো মানবাধিকারকর্মী পরিচয় দিয়ে থাকে। তার সহযোগী অপর দালালরা হলো আলমপুরের রুবেল আহমদ, আমিন উদ্দিন, কবির মিয়া, জানু মিয়া, তামিম আহমদ, দেলোয়ার হোসেন, শামিম আহমদসহ আরো ১০/১২ জনের একটি সিন্ডিকেট। সকাল হলেই এরা পাসপোর্ট অফিসের সামনে, পাসপোর্ট অফিসের ভিতরে ভিড় করে। সোমবার কিরন দেবনাথ কখনো নিজেকে
বাংলার মাটির সাংবাদিক, কখনো বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার সাংবাদিক, অথচ বাংলার মাটির প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক আখলিছ আহমদ চৌধুরী বলেন, কিরন দেবনাথ নামে আমার কোন সাংবাদিক নেই। কোন দালাল আমার পত্রিকায় নাই। কোন দালাল সাপ্তাহিক বাংলার মাটির পরিচয় দিলে তাকে পুলিশে দেন। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সকল নিয়োগ বাতিল করে দিয়েছি। সিলেট শহরে কিরন দেবনাথ নামে আমাদের কোন সাংবাদিক নেই। তবে উপজেলায় একজন রয়েছেন কিরণ নামে, তিনি মাঝে মাঝে নিউজ পাঠান যদিও তাকে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এদিকে দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার ব্যুরোচীফ মোশারফ হোসেন বলেন, কিরন দেবনাথ নামে আমাদের কোন সাংবাদিক নেই। আমি ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করেছি, কিরন দেবনাথ নামে সিলেটে আমাদের কোন সাংবাদিক নেই। কেউ পরিচয় দিলে তাকে পুলিশে দেন।সোমবার পাসপার্ট অফিসে কিরন দেবনাথের সাথে কথা হলে, তিনি নিজেকে পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন আর অফিস সহকারী জাকির হোসেনের হয়ে কাজ করে থাকেন বলে জানান।
গর্বের সাথে তিনি বলেন, আমারে পরিচালক মামুন স্যার ও জাকির নিয়োগ দিয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় সাপ্তাহিক বাংলার মাটি পত্রিকায় পাসপোর্ট অফিসের দূর্নীতির এসব সংবাদ প্রকাশ হলে জনৈক ব্যক্তি এসে বিজ্ঞাপন আকারে ঐ পত্রিকায় একটি প্রতিবাদ সংবাদ প্রকাশ করান। পরে দেখা যায় প্রকাশিত নিউজে দালাল কিরন দেবনাথ এর নাম চলে আসায়, সে বিজ্ঞাপন আকারে প্রতিবাদটি প্রকাশ করায়। কারন পাসপোর্ট অফিসে তার ফাইল বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। উক্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশের ঐ ব্যক্তির তৎপরতা নিয়ে সন্দেহ হলে এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে নামেন।
দীর্ঘ ১৫ দিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সেই কিরন দেবনাথ যে নিজেকে পাসপার্ট অফিসের পরিচালক আর অফিস সহকারী জাকিরের দালাল হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকে। পাসপোর্ট অফিসের সামনে পোজন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি দোকান ভাড়া নিয়েছে দালালির জন্য। এ দোকানে বসেই কিরন দেবনাথ পাসপোর্ট অফিসের দালালী করে আসছে দীর্ঘ ১৫ বছর থেকে। গত বছরে দালালি করতে গিয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের হাতে আটক হয়ে কারা বরণ করেন।
এদিকে এই কিরনই সাংবাদিকদের কয়েকদিন আগে পাসপোর্ট অফিসের দালালীর গোপন সকল তথ্য সরবরাহ করেছিলো সাংবাদিকদের কাছে । পাসপোর্ট অফিস থেকে কোন কোন সাংবাদিক, কোন কোন পত্রিকার নামে প্রতিদিন কয়টি করে ফাইল জমাদেন সে তথ্য প্রদান করে সে । যা এ প্রতিবেদকের কাছে রেকর্ড রয়েছে।
এদিকে পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মামুনের দুদকের মামলায় একটি চার্জসিট দাখিল করেছেন দুদুক। সর্বশেষ নতুন করে সাবেক আইজিপি ডা. বেনজির আহমদের পাসপোর্টের তথ্য জালিয়াতির ঘটনায় আরেকটি মামলা হলে সেই মামলায় আসামী করা হয় সিলেট পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। কারণ সেই সময় তিনি ছিলেন ঢাকা পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক পদে কর্মরত।
সম্প্রতি সিলেট পাসপোর্ট অফিসের দূর্নীতি নিয়ে দৈনিক সকালের সময় সহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে সিলেট পাসপোর্ট অফিস থেকে ৪ কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলী করা হয়, সেই আদেশে অফিসের এডি অন্যত্র বদলী হয়ে যোগদান করেছেন। আর বাকিরা ঘাপটি মেরে বদলীর আদেশ ঠেকাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিরন দেবনাথ আরো জানান, নতুন মামলা হওয়ার পর পরিচালক মামুন স্যার ঢাকায় গিয়েছিলেন নিজের মামলা থেকে বাঁচতে । পরে তিনি সেখানে টাকা পয়সা দিয়ে সব ম্যানেজ করে এসেছেন। পরপর দুটি মামলা থাকার পর পরিচালক মামুন স্যার নিজের ক্ষমতার জোরে চাকরি করছেন । আওয়ামীলীগ সরকার থাকতে তার কিছু হয়নি। অন্তবর্তীকালীন সরকার আসার পর উনার কিছু হয়নি। পাসপোর্ট অফিসে কত টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়, এমন প্রশ্নে কিরন দেবনাথ জানিয়ে ছিলেন, প্রতিদিন মার্কার সিন্ডিকেট, ট্রাভেলসসহ দালালের মাধ্যমে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়ে থাকে। রাতে টাকাগুলো জাকির সাহেবের মাধ্যমে ভাগবাটুরা হয়ে মামুন স্যারের কাছে যায়। কারণ দালাল আর মার্কার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করেন অফিস সহকারি জাকির হোসেন। পাসপোর্ট অফিসে দুদক আর ভ্রাম্যমান আদালতে অভিযান এড়াতে পাসপোর্ট অফিসের আশেপাশে ৮ টি দোকান রয়েছে বিভিন্ন নামে। এসব দোকানের বসে কাজ করেন দালালরা ।