নিজস্ব প্রতিবেদক ও নজরুল ইসলাম: ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, ‘গাড়ি চলে না চলে না, চলে না-রে গাড়ি চলে না, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি, কিংবা ‘কোন মেস্তরী নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ুর পঙ্খী নাও।’ এমন অসংখ্য জনপ্রিয় দিন বদলের গানের জনক বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। আজ ১২ সেপ্টেম্বর এ গুণী সাধক মহাপুরুষের ১১ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
এদিকে বাউল সম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকীতে এবার নেই কোনো কর্মসূচি। তবে উদীচী দিরাই উপজেলা শাখার আয়োজনে ১২ সেপ্টেম্বর রাতে গানে গানে ফেইসবুক লাইভে তাকে স্মরণ করা হবে। অনেকটা নিরবে কাটছে বাউল সম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকী।
সমাজ পরিবর্তনের চারণকবি একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেয়া এ বাউল সম্রাট মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মানুষকে আনন্দ দেবার পাশপাশি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির কথা গানে গানে জানিয়ে গেছেন। নিলোর্ভ-নিরহংকার কিংবদন্তিতুল্য এই বাউল শিল্পী ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর সর্বস্তরে বিশেষ করে সাধারণের কাছে আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন মরমী সাধক। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারী শাহ আব্দুল করিম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টম্বর তার কোটি কোটি ভক্তকে ছেড়ে চলে যান ইহলেক থেকে। জীবদশ্মায় তিনি রচনা করেন, আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে ও শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র নামে জনপ্রিয় সব গানের বই।
হাজারও কালজয়ী গানে যেমন আনন্দ ছিল তেমনি ছিল দেশপ্রেশ ও জীবন সংগ্রামের প্রেরণা। তিনি গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউলা গানে মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়, প্রেম, বিরহ, স্রষ্টার সৃষ্টি দর্শণ নিয়ে গান গাইতে গাইতে পুরো ভাটি অঞ্চলে তাঁর নাম ছড়িয়ে দিয়েছে ভাটি অঞ্চল তথা বাংলা ভাষাবাসি এপার ওপার দুই বাংলায়। এরপর তাঁর গানে মুগদ্ধ হয়ে বাউলরা তাকে বাউল সম্রাটের উপাধি দেন। তিনি ভাষার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে সময় গণসংগীত গেয়ে গেয়ে লাখ লাখ তরুণকে উজ্জীবিত করেছেন।
কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক এ্যাওয়াডসহ দেশ বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বাংলা সঙ্গীতের জগতে ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি। বাংলা মাটির মমতায় তার বাণী ছিল পুষ্ট। দেশজ লোক সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধ করেছেন। গেয়েছেন দেশপ্রেম, গণসংগিত, দেহতত্ত¡, মারিফতি সহ নির্যাতিত নিপিরিত মানুষের মুক্তির অসংখ্য গান। তিনি অসাম্প্রদায়িকতার গান গাওয়ার জন্য ধর্মান্ধদের হাতে নির্যাতিত ও ঘর ছাড়া হলেও কিংবদন্তিতুল্য মানুষটি অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান প্রচার করে গেছেন আমৃত্যু।
শাহ আবদুল করিমের স্মৃতি বিজড়িত নানান নিদর্শন, স্মারক, পদক ও বিভিন্ন সম্মাননা রাখার জন্য হয়েছে যাদুঘর, হয়েছে সমাধিও। তবে তার নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয় ৪০ বছরেও চালু করা যায়নি। বহু আশ্বাসের পরও এখনো হচ্ছেনা কম্পপ্লেক্স ভবন নির্মানের কাজ। তাই দ্রুত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সংগীতালয় চালু করার দাবি জানান বাউল বক্তবৃন্দরা।
বাউল শিল্পি আশিক মিয়া বলেন, বাউল শিল্পিরা দূর দূরান্ত থেকে এসে বসার জায়গা পায়না। এছাড়া গান চর্চা করার জন্য নেই সংগীতালয়। বাউল শিল্পি ও বক্তবৃন্দ এবং তরুণ প্রজন্মের গান চর্চার জন্য দ্রুত সংগীতালয় চালু করার দাবি জানান।
শাহ আব্দুল করিম পরিষদ দিরাই শাখার সভাপতি আপেল মাহমুদ বলেন, শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এবার কোনো কর্মসূচি নেই। বাউল সম্রাটের জন্ম অথবা মৃত্যুবার্ষিকীতে সরকারি কোনো উদ্যেগ থাকে না। কৃষ্টিয়াতে যেভাবে লালন সাঁইকে নিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কর্মসূচি পালন করা সেভাবে যদি শাহ আব্দুল করিমের জন্ম অথবা মৃত্যুবার্ষিকীতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পালন করার দাবি জানান তিনি।
শাহ আবুল করিম এর একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল জানান, শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে কোন কর্মসূচি নেই এবার করোনা পস্থিতিতর কারণে। তবে তার নিজ বসত ভিটা উজানধলে শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়ীতে পারিবারিক পরিমন্ডলে কিছু আয়োজন (মিলাদ-মাহফিল ও করিমগীতি পরিবেশনা) থাকছে ১২ সেপ্টেম্ব সন্ধায়।
একাডেমিক কম্পপ্লেক্স ভবন নিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে গুণী শিল্পীর প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যালয় এখনও চালু না হওয়ায় শুদ্ধ ও অবিকৃত সুরে তার গানের চর্চা সম্ভব নয় বলে মনে করেন করিম ভক্তবৃন্দ। দাবি উঠেছে দ্রুততম সময়ে কম্পপ্লেক্স ভবন নির্মানের। তারই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাউল শাহ আব্দুল করিম কমপ্লেক্স তৈরির প্রকল্প প্রস্তুত করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সখি কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান, ঘাঁটু গান গাইতাম, ‘কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলেসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা শাহ আব্দুল করিম না থাকলেও গানে আর সুরে তিনি আমাদের মাঝে অনন্তকাল থাকবেন।