বিশেষ প্রতিবেদক :: সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে এখন চোরাচালান আর চাঁদাবাজির মহোৎসব। পটপরিবর্তন হলেও বদলায়নি সীমান্তের দৃশ্যপট। বিছনাকান্দি ও হাদারপাড় এলাকায় স্থানীয় থানার ওসির নাম ভাঙিয়ে ভারতীয় গরু-মহিষের বিশাল হাট বসিয়েছেন গোলাম হোসেন ওরফে “বুঙ্গাড়ী গোলাম”।
উপজেলার বিছনাকান্দি ইউনিয়নের উপর গ্রামের আলোচিত চোরাকারবারি গোলাম হোসেন ওরফে ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম হোসেন’। গোলাম হোসেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সিন্ডিকেট বগাইয়া ও মনেরতল, দমদমিয়া, সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।অভিযোগ আছে, পশুর আড়ালে এই রুট দিয়ে ভারত থেকে অবাধে আসছে মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও।
এক সময় সিলেটের গোয়াইনঘাট ছিল সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমেদের সিন্ডিকেটের দখলে। বিগত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার হাতবদল হলেও সীমান্তের চিত্র রয়ে গেছে আগের মতোই। এখন এই জনপদে অঘোষিত সম্রাট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বিছনাকান্দির ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম’ হোসেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, থানার ওসির কথিত ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন এই গোলাম হোসেন। প্রতিটি ভারতীয় গরু ও মহিষ থেকে দুই হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে তার বাহিনী। প্রতিবাদ করলেই জোটে হুমকি-ধামকি আর হামলা-মামলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, “সে নিজেকে ওসির লোক দাবি করে। বলে যে উপরের সব জায়গা ম্যানেজ করা। ওসি ও এসপি, এমনকি বিজিবিকে ম্যানেজ করে আমারা ব্যবসা করি। তাই আমরা ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারি না। তার সিন্ডিকেটে মেম্বারসহ আরও প্রভাবশালীরা আছে।”
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। শুধু গরু-মহিষ নয়, পশুর পালের আড়ালে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে মরণনেশা মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এই চোরাই পণ্যগুলোকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে হাদারপাড় ও তোয়াকুল, পিরেরবাজার, বাজারের ভুয়া রসিদ।
স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে জানান, “মাঝে মধ্যে বিজিবি গরু ধরছে ঠিকই, কিন্তু মূল হোতারা সব সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই সিন্ডিকেট না ভাঙলে সীমান্ত নিরাপদ হবে না।” কয়েকমাস আগে ৪৮ বিজিবি বিছনাকান্দি থেকে ২৩৭টি গরুর বিশাল এক চালান আটক করে, যা সিলেটের সীমান্ত ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আটক হিসেবে স্বীকৃত।
অভিযোগ রয়েছে, এই চালানের নেপথ্যেও ছিল গোলাম হোসেন, কয়েস ও জালাল মেম্বারের সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় বিছনাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলয়ের অনুসারী হিসেবে পরিচিত থাকলেও, পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি ‘বিএনপি কর্মী’ ও ‘তারেক রহমানের আদর্শের সৈনিক’ সেজেছেন গোলাম হোসেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ‘ঘনিষ্ঠ’ দাবি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছেন। নিজেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ দাবি করলেও, মন্ত্রী দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে এসব অপরাধীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এদিকে, ওসির নাম ভাঙিয়ে এমন কর্মকাণ্ড চললেও রহস্যজনক ভাবে নীরব স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
বিজিবি ও স্থানীয়দের শঙ্কা: বিছনাকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের কর্মকর্তারা জানান, চোরাচালান রোধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সিন্ডিকেট সদস্যরা স্থানীয় প্রভাবশালী হওয়ার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কেউ প্রতিবাদ করলে গোলাম হোসেন বাহিনী তাদের প্রশাসনিক হেনস্তা ও হামলার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়াইনঘাটের এই ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম’ সিন্ডিকেট উপড়ে না ফেললে সীমান্তের নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকিতে থাকবে, তেমনি রাজস্ব হারাবে সরকার। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের টনক নড়ে কি না। গোয়াইনঘাটের সাধারণ ব্যবসায়ী ও শান্তিকামী মানুষ মনে করছেন, ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম’ সিন্ডিকেট শুধু সীমান্তের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত করছে না, বরং মাদকের বিস্তারে যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অঘোষিত সম্রাটের ক্ষমতার উৎস ও চোরাচালানের উৎস বন্ধে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
সুত্রঃ : বাংলা সংবাদ