বিশেষ প্রতিনিধি: ‘গাড়ি চলে না চলে না, চলে না-রে গাড়ি চলে না, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান, ঘাঁটু গান গাইতাম’ কিংবা ‘কোন মেস্তরী নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ুর পঙ্খী নাও, দীন হতে দিন আসে যে কঠিন।’ এমন অসংখ্য জনপ্রিয় দিন বদলের গানের জনক শাহ আবদুল করিম। আজ ১২ সেপ্টেম্বর এ গুণী সাধক মহাপুরুষের ১১ তম প্রয়াণ দিবস। শাহ্ আবদুল করিমের স্মৃতি বিজড়িত নানান নিদর্শন, স্মারক, পদক ও বিভিন্ন সম্মাননা রাখার জন্য হয়েছে যাদুঘ এবং হয়েছে সমাধিও। তবে তার নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত শাহ্ আব্দুল করিম সংগীতালয় ৪০ বছরেও চালু কারা যায়নি। বহু আশ্বাসের পরও এখনো হচ্ছেনা কম্পপ্লেক্স ভবন নির্মানের কাজ।
সমাজ পরিবর্তনের চারণকবি একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের ১২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেয়া বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মানুষকে আনন্দ দেবার পাশপাশি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির কথা গানে গানে জানিয়ে গেছেন। নিলোর্ভ-নিরহংকার কিংবদন্তিতুল্য এই বাউল শিল্পী ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর সর্বস্তরে বিশেষ করে সাধারণের কাছে আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন মরমী সাধক।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারী শাহ আব্দুল করিম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টম্বর তার কোটি কোটি ভক্তকে ছেড়ে চলে যান ইহলেক থেকে। জীবদশ্মায় তিনি রচনা করেন, আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে ও শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র নামে জনপ্রিয় সব গানের বই।
হাজারও কালজয়ী গানে যেমন আনন্দ ছিল তেমনি ছিল দেশপ্রেশ ও জীবন সংগ্রামের প্রেরণা। তিনি গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউলা গানে মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়, প্রেম, বিরহ, স্রষ্টার সৃষ্টি দর্শণ নিয়ে গান গাইতে গাইতে পুরো ভাটি অঞ্চলে তাঁর নাম ছড়িয়ে দিয়েছে ভাটি অঞ্চল তথা বাংলা ভাষাবাসি এপার ওপার দুই বাংলায়। এরপর তাঁর গানে মুগদ্ধ হয়ে বাউলরা তাকে বাউল সম্রাটের উপাধি দেন। তিনি ভাষার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে সময় গণসংগীত গেয়ে গেয়ে লাখ লাখ তরুণকে উজ্জীবিত করেছেন।
কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক এ্যাওয়াডসহ দেশ বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম বাংলা সঙ্গীতের জগতে ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি। বাংলা মাটির মমতায় তার বাণী ছিল পুষ্ট। দেশজ লোক সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধ করেছেন। গেয়েছেন দেশপ্রেম, গণসংগিত, দেহতত্ত্ব, মারিফতি সহ নির্যাতিত নিপিরিত মানুষের মুক্তির অসংখ্য গান। তিনি অসাম্প্রদায়িকতার গান গাওয়ার জন্য ধর্মান্ধদের হাতে নির্যাতিত ও ঘর ছাড়া হলেও কিংবদন্তিতুল্য মানুষটি অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান প্রচার করে গেছেন আমৃত্যু।

ধলগ্রামের বাসিন্দা আপেল মাহমুদ বলেন, বাউল সম্রাটের স্বপ্ন ছিল সংগীতালয়। তিনি নিজেই সেটি তৈরী করে গিয়েছিলেন। শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয়টি চালু হলে সঠিক সুর, সঠিক কথায় গানগুলো প্রচার করা যাবে এবং এখনে এসে বাউল ভক্তরা বা দেশের বিভিন্ন পান্ত থেকে আসা মানুষজন গানের মধ্যে তাকে হয়তো খোঁজে পাবে।
শাহ্ আবুল করিম এর একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল বলেন, দেখতে দেখতেই ১২ বছর পার হয়ে গেলো। এই প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের বাড়িতে(উজান ধল গ্রামে) যেখানে বাবা-মা সায়িত রয়েছেন। সেখানে ছোট-খাটো করে বাবার মৃত্যুবাষির্কী পালন করা হবে। এই বর্ষার মৌসুমে ধল গ্রামে আমাদের বাড়ির চারদিকে পানি থাকায় বাবার ভক্তবৃন্দদের বসতে দেয়ার জায়গাও নাই। তারা নৌকায় থেকে থেকে গান বাজনা করেন। শাহ আব্দুল করিম স্মৃতি জাদুঘরের সামনে যে জায়গা আছে সেটিতে যদি মাঠি ভরাট করা যেতো তাহলে ভক্তবৃন্ধরা বসার জায়গা পেতো।
শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয় প্রসঙ্গে বলেন, বাবা জীবিত অবস্থায় নিজের হাতে শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয় করেছিলেন। কিন্তু নিজের হাতে গড়া স্বপ্নের সংগীতালয়টি সেই সময়ে যেভাবে করা হয়েছিল আজও এরখম রয়ে গেছে। আলোর মুখ দেখলো না। অথচ. শাহ্ আব্দুল করিমের গান শেখার জন্য অনেকে আসেন কিন্তু এখানে সেই সুযোগ সুবিধা না থাকাতে তারা এটা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শাহ্ আব্দুল করিম সংগীতায়টি যদি হয় তাহলে সঠিক বাণীতে গানগুলো প্রচার-প্রসার হবে। আমরা খুবই আশাবাদি সংস্কৃতিবান্ধন সরকারের আমলেই আমার পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, বাউল সম্রাটের প্রয়াণ দিবসে জেলা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। যেহেতু কভিড-১৯ পরিস্থিতি বৃদ্ধমান রয়েছে এ কারণে অনলাইনে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এখানে সুনামগঞ্জ ও দিরাইয়ের বাউল শিল্পীরা অংশ নিবেন। তবে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কমপ্লেক্স করার যে কথা রয়েছে সেটির কাজ দ্রুত শুরু হবে।
প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে গুণী শিল্পীর প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যালয় এখনও চালু না হওয়ায় শুদ্ধ ও অবিকৃত সুরে তার গানের চর্চা সম্ভব নয় বলে মনে করেন করিম ভক্তবৃন্দ। দাবি উঠেছে দ্রুততম সময়ে কম্পপ্লেক্স ভবন নির্মানের।